অভাব-অনটন মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। কখনো সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, কখনো ঋণের বোঝা চেপে বসে। আবার অনেক সময় কঠোর পরিশ্রমের পরও উপার্জনে প্রত্যাশিত বরকত পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন।
ইসলামের শিক্ষা হলো, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন, আবার কাউকে অভাবের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। তাই সংকটের সময় ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা একজন মুমিনের কর্তব্য।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অভাব-অনটন, দুশ্চিন্তা এবং রিজিকে বরকত লাভের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও দোয়ার কথা এসেছে। চলুন, সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
অভাবের মধ্যেও আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দার প্রতি নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
অর্থ: ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
সুতরাং অভাবের সময়ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। তাঁর রহমতের আশা রাখতে হবে এবং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) অভাব, স্বল্পতা, অপমান এবং জুলুম করা ও জুলুমের শিকার হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ، وَالْقِلَّةِ، وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়াজ জিল্লাতি, ওয়া আউজুবিকা মিন আন আজলিমা আও উজলামা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অপমান থেকে। আর আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই, কাউকে জুলুম করা থেকে এবং কারও দ্বারা অত্যাচারিত হওয়া থেকে।
(সুনানে আবু দাউদ: ১৫৪৪)
এই দোয়াটি পড়ে আল্লাহর কাছে অভাব, অপমান ও অন্যায়-অত্যাচার থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা যায়।
পবিত্র কুরআনে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা আল্লাহর কাছে আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ দস্তরখান অবতীর্ণ করার আবেদন করেছিলেন। তাঁদের সেই প্রার্থনায় রিজিক চাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামায়ি, তাকুনু লানা ঈদাল লি-আউয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াতাম মিনকা। ওয়ারযুকনা ওয়া আনতা খাইরুর রাজিকিন।
অর্থ: হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ একটি দস্তরখান অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।
(সুরা আল-মায়িদা: ১১৪)
এই আয়াতটি মূলত হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীদের বিশেষ প্রার্থনা। এতে আল্লাহর কাছে রিজিক প্রার্থনার সুন্দর শিক্ষা রয়েছে।
অভাব-অনটন ও সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইস্তিগফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। পবিত্র কুরআনে হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا
অর্থ: অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।
(সুরা নূহ: ১০–১২)
ইস্তিগফারের সহজ আমল
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
অর্থ: আমি প্রতিদিন একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তওবা করি।
(সহিহ মুসলিম: ২৭০২)
এ ছাড়া ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে—
مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
(সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮)
আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা রাখা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) পাখির উদাহরণ দিয়ে তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন—
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ
অর্থ: তোমরা যদি যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দান করতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দান করেন।
(জামে তিরমিজি: ২৩৪৪)
পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পরিতৃপ্ত অবস্থায় ফিরে আসে। এই হাদিস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনাও করতে হবে। শুধু বসে থেকে রিজিকের অপেক্ষা করা তাওয়াক্কুল নয়।
অভাব-অনটন ও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে হালাল রিজিকের জন্য দোয়া করা উচিত।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখুন।
(জামে তিরমিজি: ৩৫৬৩)
অভাব-অনটন জীবনের একটি পরীক্ষা। তাই অভাবের কারণে হতাশ হওয়া কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। নিয়মিত নামাজ আদায়, বেশি বেশি ইস্তিগফার, দোয়া, কৃতজ্ঞতা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শুধু সম্পদের প্রাচুর্যই রিজিক নয়। সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি, পরিবারের ভালোবাসা, অল্প সম্পদে তৃপ্তি এবং উপার্জনে বরকত—সবই আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অভাব-অনটন দূর করুন, ঋণমুক্ত জীবন দান করুন, হালাল রিজিকে বরকত দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |