প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক নির্যাতন, উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার কারণে পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের জীবন এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তার বড় ছেলে সুলাইমান খান। গত আগস্ট মাসের পর থেকে পরিবারের সদস্য কিংবা আইনজীবীদের কাউকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের বা দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে সুলাইমান স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, তার বাবার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হলে এর সম্পূর্ণ দায় কার ওপর বর্তাবে, তা নিয়ে যেন কারও মনে বিন্দুমাত্র সংশয় না থাকে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতির সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথের পুত্র সুলাইমান অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত আক্রোশ ও প্রত্যক্ষ কারণেই তার বাবাকে বছরের পর বছর ধরে বেআইনিভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। সুলাইমানের দাবি, কারাবন্দি হওয়ার আগেই ইমরান খান আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, মিশরের সাবেক গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতো মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হতে পারেন তিনি।
যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা ও মুরসির পরিণতির আশঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া জোরালো বার্তায় সুলাইমান উল্লেখ করেন, গত আগস্ট মাসের পর থেকে পরিবারের কেউই তার বাবাকে সরাসরি দেখতে পাননি বা তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ পাননি। মূলত গত ওই মাসেই ইমরান খান কারাগারের ভেতর তাঁর ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন চালানোর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেছিলেন। সুলাইমানের তীব্র অভিযোগ, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতো সুপরিকল্পিত উপায়ে তার বাবাকেও কারাগারেই তিলে তিলে হত্যার বা নিঃশেষ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ইমরান খানের সুচিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের অধিকার নিয়ে সুলাইমান জানান, এ বিষয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পর্যন্ত চরমভাবে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর আগে গত আগস্টে দেশটির শীর্ষ আদালত ইমরান খানকে অবিলম্বে বেসরকারি ‘শিফা হাসপাতালে’ মেডিকেল চেকআপ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ দিতে এবং তাঁর পরিবার ও আইনজীবীদের নিয়মিত সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ার আইনি নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
জনপ্রিয়তার আতঙ্ক ও কারাবন্দি দশা সুলাইমান আরও বলেন, পাকিস্তানের ইতিহাসে বর্তমান সময়েও তার বাবা দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই বিশাল জনসমর্থন ও রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাই দেশটির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তাকে সবচেয়ে বেশি ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। এ কারণে তাঁকে শারীরিক ও মানিকভাবে ভেঙে দেওয়ার নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। ৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান দুর্নীতি ও নানা রাজনৈতিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত আদিয়ালা কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একশটিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে শুরু থেকেই ইমরান খান ও তাঁর দল এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
অন্যদিকে, ইমরান খানের ওপর নির্যাতন, নির্জন কারাবাস ও চিকিৎসা না দেওয়ার যাবতীয় অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে পাকিস্তান সরকার। গত আগস্টে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক লিখিত জবাবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করে, বর্তমান সরকারের কোনো রাজনৈতিক আদেশে ইমরান খানকে আটকে রাখা হয়নি; বরং আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আদালতের রায়ে একজন দণ্ডিত কারাবন্দি হিসেবেই তিনি কারাগারে অবস্থান করছেন।
পরিবারের ওপর চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিশ্বজুড়ে ও পাকিস্তানে প্রচারণা চালানোর প্রেক্ষাপটে তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও চাপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের অন্য নারী সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর সুলাইমান ও তাঁর ভাই কাসিম খানকে তাঁদের বাবার মুক্তির দাবিতে রাজপথে কোনো ধরনের প্রচারণায় অংশ না নিতে পাকিস্তানে না যাওয়ার কড়া পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিবাদের ঠিক আগে পাঞ্জাব মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার অর্ডিন্যান্সের অজুহাতে ইমরান খানের তিন বোন—আলিমা খান, উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকে আটক করে পুলিশ। পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত সোমবার তাঁদের আটকাদেশ আরও ৩০ দিনের জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এদিকে কারাগারের কঠোর প্রাচীরের আড়ালে থেকেও পাকিস্তানে ইমরান খানের রাজনৈতিক আকর্ষণ ও জনসমর্থন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে তাঁর অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে হাজার হাজার সাধারণ সমর্থক ও দলীয় নেতাকর্মী অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা তাঁর মুক্তি, কারাবন্দি অবস্থায় নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত পছন্দমতো চিকিৎসকদের মাধ্যমে সুচিকিৎসার দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি পালন করেন।
অন্যদিকে গত ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে আকস্মিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং একই সঙ্গে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত বা বরখাস্ত করেন। আফগান সীমান্তসংলগ্ন ওই অঞ্চলের সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতাকে জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে সরকার। তবে পিটিআই এই পদক্ষেপকে ‘জরুরি অবস্থার ছদ্মবেশে একধরনের সুপরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অভিযোগ তুলেছে যে, মূলত কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির গণআন্দোলনকে চিরতরে দমন ও দুর্বল করতেই সরকার এই চক্রান্তমূলক পথ বেছে নিয়েছে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |