প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
আসন্ন পহেলা নভেম্বর থেকে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এই বাড়তি আর্থিক সংকুলান করতে গিয়ে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এর ফলে অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বর্ধিত ব্যয় মেটাতে ১৪ দিনমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে মাত্র একদিনেই আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে চলতি অক্টোবর মাসেই শুধু ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়।
ঋণের কারণ ও রাজস্ব ঘাটতির চিত্র নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, বর্ধিত বেতনের সিংহভাগ অর্থ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বাড়ানোর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আয় বাড়েনি। উল্টো বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের তুলনায় আসল ও সুদ পরিশোধের রেকর্ড চাপে সরকারের সামগ্রিক বাজেট ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বৈদেশিক ঋণের নতুন সহায়তার তুলনায় পুরোনো ঋণ ও সুদ পরিশোধে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এই তিন মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার পরিশোধ করা হলেও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন পাওয়া গেছে মাত্র ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ, নতুন সহায়তার চেয়ে প্রায় ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বেশি অর্থ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেই চলে গেছে।
বিদেশি ঋণ ও সহায়তা কমে যাওয়ায় এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়েই সরকারকে এখন অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত, সঞ্চয়পত্র এবং ট্রেজারি বিল-বন্ডের মতো উৎসগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। আর প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া নিট ঋণের পরিমাণ ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
নবম পে-স্কেলের বিশাল আর্থিক চাপ বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত জুনে বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে দুই বছরে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
নতুন বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বকেয়া বেতন একসঙ্গে পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে বড় ধরনের নগদ অর্থের সংকটে পড়তে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য প্রভাব সরকারের এই ঋণনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “ত্রৈমাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কোনোটিই অর্জিত না হওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। তবে বকেয়া বেতন পরিশোধে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলেও, সরকার যখন এভাবে পাইকারি হারে ঋণ নেয়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।”
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গেলে তা সাধারণ মানুষের ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত কেনাকাটার ক্ষমতা বা ভোক্তা চাহিদা এমনিতেই বেশ নিম্নমুখী।
দীর্ঘমেয়াদে এই আর্থিক সংকট মোকাবেলার পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারকে শুধু ঋণ নেওয়ার ওপর ভরসা না করে ব্যয় সংকোচনের পথ খুঁজতে হবে। সরকারি দপ্তরে খালি থাকা পদগুলোতে নতুন নিয়োগ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং বড় ধরনের বাজেট ব্যবস্থাপনার সংস্কার আনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |