প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগানের আড়ালে আইসিটি ও টেলিকম খাতে সংঘটিত হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত অপচয়। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রস্তুত করা শ্বেতপত্রের কিছু অংশ যুগান্তরের হাতে এসেছে, যেখানে এই দুটি খাতের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও নীতি ভাঙনের বিস্ফোরক তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।
টাস্কফোর্সের মতে, আইসিটি খাতকে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ বিতরণের একটি ‘রাজনৈতিক ইকোসিস্টেম’-এ পরিণত করা হয়েছিল, যার প্রায় প্রতিটির পেছনে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তাকে সহায়তা করেন দায়িত্বরত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা, যাদের মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন জুনায়েদ আহমেদ পলক। টাস্কফোর্স এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় নৈতিক প্রভাব’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
শ্বেতপত্রের তথ্যানুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বর্তমান নাম বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১) প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এর মূল অভিযোগগুলো হলো:
সম্ভাব্যতা যাচাই উপেক্ষা: যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়।
অতিরিক্ত ব্যয় ও অস্পষ্ট পরিকল্পনা: অতিরিক্ত ব্যয়, অস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবের প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করা হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব: টাস্কফোর্স এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জয়ের অর্থ পাচার প্রকল্প: টাস্কফোর্সের ভাষায়, এই প্রকল্পটি ছিল মূলত শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের অর্থ পাচারের প্রকল্প।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ-এর নেতৃত্বে প্রস্তুতকৃত আইসিটি খাতের শ্বেতপত্রে ৬৫০ পৃষ্ঠাজুড়ে অনিয়ম, পদ্ধতিগত অপচয় ও দুর্নীতির প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে ডিজিটাল কানেকটিভিটি, হাইটেক পার্ক, এ-টু আই এবং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের দুর্নীতি উঠে আসে।
ব্যয় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন: আইসিটি খাতের প্রায় সব প্রকল্পেই ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল।
নির্দিষ্ট কোম্পানিকে বারবার কাজ: একই কোম্পানি বারবার ভিন্ন নামে টেন্ডার পেত।
প্রশিক্ষণের নামে লোপাট: প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা গেছে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে।
এ-টু আই: ভ্যালু ফর মানি পর্যালোচনা নেই: এ-টু আই প্রকল্পে 'ভ্যালু ফর মানি' পর্যালোচনা করা হয়নি কখনোই।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ৪২টি প্রকল্প পর্যালোচনা করে প্রস্তুতকৃত আড়াই হাজার পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রটিকে আরও বিস্ফোরক বলা হচ্ছে।
এসওএফ (সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড) লোপাট: দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে গঠিত ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ৭টি প্রকল্প অনুমোদনে চরম অনিয়ম পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক সিন্ডিকেট: টেলিকম খাত পর্যালোচনাকারী কমিটির মন্তব্য, ‘এসওএফ ফান্ড কার্যত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের হাতে চলে গিয়েছিল।’
লাইসেন্স নীতিতে ভিআইপি সুবিধা: টেলিকম লাইসেন্সের নীতিতে সাধারণ মানুষের জন্য এক নিয়ম এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের জন্য ছিল আরেক (ভিআইপি) নিয়ম। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি কোম্পানি অস্বাভাবিক দ্রুত সময়ে লাইসেন্স পেয়েছে, নীতিমালা উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে এবং প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে বিশেষ শর্তও বাতিল করে দেওয়া হয়।
জাতীয় নেটওয়ার্ক বেসরকারি আধিপত্যে: রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার সম্পদ জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্ককে বেসরকারি কোম্পানি— যেমন সামিট কমিউনিকেশনস ও ফাইবার অ্যাটহোম-এর আধিপত্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা নেটওয়ার্ক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বিটিআরসির 'নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি': বিটিআরসি বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত নিয়োগ, অযোগ্যদের বিশেষ সুবিধা, নিয়ম পরিবর্তন এবং অবসরপ্রাপ্তদের পুনরায় নিয়োগের মাধ্যমে ‘নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রীয় দুই অপারেটর বিটিসিএল ও টেলিটকের পর্যবেক্ষণ আরও হতাশাজনক। রাজনৈতিক সুপারিশে অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নীতিবহির্ভূতভাবে স্থায়ী করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
টাস্কফোর্সের সারসংক্ষেপ মন্তব্য পুরো চিত্রটা পরিষ্কার করে, “অপারেশনাল বিশৃঙ্খলা এবং শাসনব্যবস্থার ভাঙন দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে পিছিয়ে দিয়েছে অন্তত এক দশক।”
তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীর্ষ হায়দার চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন, শ্বেতপত্রটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে একটি সম্মেলনের মাধ্যমে এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। তিনি শ্বেতপত্রটিকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও পদ্ধতিগতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানান।
১. উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের প্রস্তুত করা আইসিটি ও টেলিকম খাতের শ্বেতপত্রের প্রাপ্ত অংশ। ২. তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর বক্তব্য (৬ ডিসেম্বর ২০২৫)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |